প্রাইমএশিয়ায় ছাত্র খুন: কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত পারভেজ, ১১ জন শনাক্ত, গ্রেপ্তার ৩

জাহিদুল ইসলাম পারভেজ (২৪)। ছবি: সংগৃহীত

 প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জাহিদুল ইসলাম পারভেজকে গত শনিবার রাজধানীর বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনেই কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেছে একদল হামলাকারী। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ১১ জনকে শনাক্ত করেছে এবং এদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাঁদের সাত দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন।


ঘটনার বিবরণ

হত্যাকাণ্ডটি ঘটে শনিবার দুপুরে, যখন পারভেজ তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ র‍্যানকন বিল্ডিংয়ের সামনে এক দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাশেই ছিল ইউনিভার্সিটি অব স্কলারসের দুই ছাত্রী ও তাঁদের বন্ধু প্রাইমএশিয়ার শিক্ষার্থীরা। পারস্পরিক হাসাহাসি ও কথার সূত্র ধরে উভয়পক্ষে তর্ক শুরু হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও শিক্ষকরা মীমাংসা করলেও ওই দিনই পারভেজের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়।


নিরাপত্তার প্রশ্নে উঠছে অভিযোগ

ঘটনাস্থলে থাকা শিক্ষার্থী সৈকতের অভিযোগ, ঘটনার সময় ফটকে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা নির্লিপ্ত ছিলেন। হামলার সময় কেউ পারভেজকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি, এমনকি ফটকের শাটার নামিয়ে দেওয়া হয়। নিরাপত্তাকর্মীদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ মুখ খুলতে নিষেধ করেছে বলেও জানা গেছে।


হামলাকারীদের পরিচয়

পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় অংশ নিয়েছে ছাত্র, অছাত্র ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিহত পারভেজের বন্ধু তরিকুলকেও হামলায় আহত করা হয়। মূল হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন—


মেহেরাজ ইসলাম (প্রাইমএশিয়া, বিবিএ)

আবু জহর গিফফারি পিয়াস (প্রাইমএশিয়া, এলএলবি)

মাহাথির হাসান (প্রাইমএশিয়া, ইংরেজি বিভাগ)


এছাড়া কিশোর গ্যাং “বেনসন গ্রুপ”-এর সদস্য আল কামাল শেখ ওরফে কামাল, আলভী হোসেন জুনায়েদ, আল আমিন সানি, রিফাত, আলী, ফাহিমসহ আরও অনেকে হামলায় জড়িত ছিলেন। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মাদক ও অন্যান্য অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।


সিসিটিভি ফুটেজ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পারভেজকে পিয়াস ও মাহাথির ধরে রাখেন এবং মেহেরাজ ছুরিকাঘাত করেন। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সোবহান নিয়াজ তুষার ও হৃদয় মিয়াজিকেও ঘটনাস্থলে দেখা গেছে।


এ নিয়ে ছাত্রদল অভিযোগ করেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা অনুচিত।


গ্রেপ্তার ও মামলা

পারভেজের চাচাতো ভাই হুমায়ুন কবীর বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তিন আসামি—কামাল, আলভী ও আল আমিনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে একজন খুলনার, একজন ময়মনসিংহের ও অন্যজন জামালপুরের বাসিন্দা হলেও তাঁরা রাজধানীতেই বসবাস করতেন।


ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও তদন্ত

পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী গ্রেপ্তারদের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া পলাতক আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে এবং ‘প্রেমিকা’ হিসেবে পরিচিত এক ছাত্রীকেও শনাক্তের চেষ্টা চলছে, যিনি পুরো ঘটনার প্ররোচনাকারী হতে পারেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।


নিহতের পরিবারে শোকের ছায়া

নিহত পারভেজ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাইচান গ্রামের কুয়েতপ্রবাসী মো. জসীম উদ্দিন ও পারভীন ইয়াসমিন দম্পতির একমাত্র ছেলে। তাঁর ছোট বোন জুইমনি ঢাকার মাইলস্টোন কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। সন্তানের মৃত্যুসংবাদে বিদেশফেরত পিতা ও পরিবারের সদস্যরা শোকাহত।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url